আমরা কেনো রাস্তার নিয়মগুলো মানতে চাই না...



সারাক্ষণ আইন নাই, নিয়ম-কানুন নাই বলে বলে ত্যানা প্যাঁচাই আমরা কিন্তু আমি তো দেখি রাস্তায় আইন ভাঙ্গি আমরা নিজেরাই।

বাড়ি থেকে বের হয়ে প্রথমে আমাকে উঠতে হয় ব্যাটারী চালিত অটোরিক্সায়।
রাস্তা সরু, দুটো অটো পাশাপাশি যেতে পারে শুধু। কিন্তু ব্যাস্ত মানুষগুলোর তো তাতে চলবে না। একটানা ড্রাইভারকে বলতে থাকবে ওভারটেক করবার জন্য। মজার বিষয় হলো, এরপর যখন জ্যাম বাঁধবে এবং ট্রাফিক পুলিশ এসে ড্রাইভারের গালে কষে একটা থাপ্পর মারবে তখন এই ব্যাস্ত মানুষ গুলো "সদ্য ভূপাতিত হওয়া বাকশক্তিহীন-শ্রবণশক্তিহীন-দৃষ্টিশক্তিহীন মূর্তির মতো বসে থাকবে", আজব !!! ওস্তাদের মাইর শেষ রাইতের মতো বলতে হয়, আসল মজা হয় এরপর। এই জ্যামটা ছুটে গাড়িটা যখন একটু সামনে যাবে, তখন তারা ধীরে ধীরে মুখ খুলে যা বলবে তা কিছুটা এরকম "এইটা একটা জীবন হলো, রাস্তায় জ্যাম জ্যাম আর জ্যাম, কোন আইন-কানুন নাই, এসব দেখার কেউ নাই" .... 

যা হোক, এরপর উঠতে চাই বাসে। কিন্তু সিটিং বাসে ফাঁকা ফাঁকা যাবো জন্য দাঁড়িয়ে থাকি। প্রায় সব বাসেই সিটিং লেখা থাকলেও অতিরিক্ত লোকে ভর্তি। জানি, আপনার ইচ্ছে করছে বাসওয়ালাদেরকে গালাগাল করতে, রাইট? কইরেন না, অবশ্য ইচ্ছে হলে করতে পারেন। তবে তার পাশাপাশি নিজেরেও কইরেন। কারণ হেল্পারের ডাকার কাজ ডেকেছে, কিন্তু আপনাকে বেঁধে নিয়ে বাসে তো উঠায় নি, তাহলে আপনি কেনো সিটিং বাস হওয়া সত্ত্বে সেটাতে উঠলেন যখন কিনা বেশ বুঝতে পারছেন যে ভেতরে সিট নেই? ওহ, তাড়া আছে, দেরী হয়ে যাবে, তাই না? তাহলে এবার শুনুন এভাবে ওঠার পর তেনারা কী করেন। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর যারা যারা সিট পায় তারা বসে যায়। এবং বসার পর নেক্সট স্টপেজ এ মজার একটা কথা তারা বলে যেটা কিছুটা এরকম "ঐ ব্যাটা সিট খালি নাই কিছু নাই, তুই লোক তোলোস ক্যান, তোরা হইতাছোস..."

বাস থেকে আবার তাদেরকে নামিয়ে দিতে হবে ঠিক তাদের বাড়ির গেটের সামনে। আক্ষরিক অর্থে বলিনি কথাটা। খুব স্বাভাবিক ভাবেই ফুটওভার ব্রীজ গুলোকে মোড় থেকে কিছুটা দূরে করা হয় এবং এর নীচে থাকে বাস-স্টপেজ (ব্যতীক্রম আছে), সে যাই হোক। এতে করে বাস থেকে নেমেই ফুটওভার ব্রীজে করে রাস্তা পার হতে পারে। মমমহহহ, তা তো হবে না। ওনাদেরকে রাস্তার মোড়েই নামিয়ে দিতে হবে কারণ ঠিক এর উল্টো পাশেই ওনাদের যেতে হবে, তাই খামাখা সামনে গিয়ে, ফুটওভার ব্রীজে উঠে ওপারে গিয়ে আবার উল্টো পথে ফেরত আসবেন কেনো ওনারা, এখানেই নামাতে হবে। বেশ নামানো হলো। এবার তো নিশ্চয় তারা রাস্তা পার হবার জন্য সিগন্যাল এর অপেক্ষা করবে, তাই না? হমমম এখনো আপনি এটাই আশা করেন !! একখানা হাত উঁচু করে বীর দর্পে রাস্তায় নেমে পড়বেন তারা। গ্রীন সিগন্যালে গাড়ি যত জোড়েই আসুক না কেনো, গাড়িকে থামতেই হবে। যদি থামতে না পারে তো ড্রাইভার-হেল্পারের মায়েরে-বাপ। তাই না?

-----------------

মাত্র কয়েকটা বিষয় বললাম। আরো কতো নিত্য-নতুন দৃশ্য যে প্রতিদিন দেখা লাগে তার ইয়ত্তা নেই। আমি জানি নানা ক্ষেত্রে যানবাহন চালক-হেল্পারদের অন্যায় আছে। কিন্তু আমরাও তো ক্ষেত্রবিশেষে তাদের অন্যায়ের সাথে সমান-তালে অন্যায় করে চলেছি, তাই না? কিন্তু কেনো? আমরা তো শিক্ষিত, আমরা জানি কোনটা অন্যায়, কোনটা ন্যায়। তারপরও কেনো করি? ঐ অজুহাতগুলোর জন্য, আমার তাড়া আছে, এমনটা করা ছাড়া উপায় নাই ইত্যাদি? এমনটা করবেন না। 

শৃঙ্খলা রক্ষা করার চেষ্টা করবেন। এতে সবাই উপকৃত হবে। একদিনে লক্ষ লক্ষ মানুষের অভ্যাস পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই হয়তো নিয়ম মানার জন্য যে উতসাহ প্রেরণা দরকার, সেটা আমরা পাই না। দেখা যায়, আমি নিয়ম মানছি, কিন্তু বাকি সবায় অনিয়ম করে এগিয়ে যাচ্ছে, তাই একদিন আমিও স্রোতে গা ভাসিয়ে দেই। আমি জানি এমনটা হয়। তবু রবি ঠাকুরের গানটা স্মরণ করে অপেক্ষা করুন, "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে", পরিবর্তন আসবে। 

আপনি মানুন, আপনাকে দেখে অন্যরা মানবে। নিয়ম মানাটা একটা প্রবণতা, ঠিক যেভাবে না মানাটাও একটা প্রবণতা। একটা ঝকঝকে তকতকে ফ্লোরে পানের পিক ফেলতে গেলেও যেমন পারিপার্শ্বিকতা বাধ্য করে তা না করবার জন্য, তেমনি সবাই নিয়ম মানতে শুরু করলে, নিয়ম না মানাটা প্রকট ভাবে চোখে পড়বে এবং সেও আর পুনরায় সেটা করবে না। 

=> রাস্তার মোড়ে হাত উঁচু করে বাস দাঁড়া করিয়ে বাসে উঠবেন না, এমনকি যদি বাস দাঁড়ায়ও তবু উঠবেন না। নির্ধারিত স্থানে দাঁড়ান, দেখবেন একসময় বাস এসে সেখানেই দাঁড়াবে। একই কথা নামার ক্ষেত্রেও।

=> রাস্তা পার হবার সিগন্যাল এর জন্য অপেক্ষা করুন। ফুটওভার ব্রীজ থাকলে অবশ্যই তা ব্যবহার করুন। 

=> পার্কিং করার জায়গা যেখানে সেখানেই পার্কিং করুন।

=> আপনার গাড়ির সাথে ধাক্কা লাগছে ইত্যাদি কারণে রাস্তায় ব্লকেজ তৈরী করে অপর ড্রাইভারের সাথে তর্কাতর্কি করবেন না।

=> নিয়ম না থাকলে ইউটার্ন নিবেন না।

=> ডানের বা বামের রাস্তা ক্রস করার জন্য গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখতে হলে সিরিয়াল মেইনটেইন করুন এবং অর্ধেকটা রাস্তা অন্যান্য গাড়ি চলাচল করবার জন্য ফাঁকা রাখুন।

এইতো এইসব, সবারই জানা কথা কিন্তু মানা হয় না। আমরা অনিয়মের মধ্যে ডুবে আছি তাই কেউ নিয়ম মানলে সেটা প্রকট ভাবে চোখে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে সে হাসির পাত্রও হয়। আপনিও প্রথম প্রথম এমন হাসির পাত্র হতে পারেন। যেমন টিকিট কাটা এবং বাসে ওঠার জন্য সিরিয়াল মেইনটেইন করছেন কিন্তু শেষমেশ বাস আসার পর দেখলেন যে যার মতো বাসে উঠতে লাগলো, এবং সিরিয়াল মেইনটেইন করতে গিয়ে আপনি বাসটা মিস করলেন। বাস ছেড়ে চলে যাবার মূহূর্তে কেউ কেউ আপনাকে তাচ্ছিলের হাসি উপহার দিতে পারেন। হাসি মুখে তা সহ্য করে নিন। এবং নিয়ম মানতে থাকুন। একদিন এরাও আপনার পেছনে এসে দাঁড়াবে নিয়ম মানবার জন্য।

"
যে তোরে পাগল বলে তারে তুই বলিস নে কিছু॥
আজকে তোরে কেমন ভেবে অঙ্গে যে তোর ধুলো দেবে
কাল সে প্রাতে মালা হাতে আসবে রে তোর পিছু-পিছু॥
আজকে আপন মানের ভরে থাক্ সে বসে গদির’পরে—
কালকে প্রেমে আসবে নেমে, করবে সে তার মাথা নিচু॥
"

সবাইকে ধন্যবাদ পড়বার জন্য। এই পোস্ট সরাসরি আপনাকে উদ্দেশ্য করে নয়,। ধন্যবাদ।

Recommended Recommends

Comments

Contact Us

Loading...