আমার গ্রাম-বেলা ... আমার মাঠ-মাটি....আমার গ্রাম....




বৃষ্টি হবার পর মাটি থেকে একটা গন্ধ আসে, হয়তোবা এটাকেই মাটির সোঁদা গন্ধ বলে, ভালো লাগে। তবে দাবদাহে পুড়তে থাকা মাটি, ক্ষেত থেকেও একটা গন্ধ আসে, সেটা আমার আরও ভালো লাগে। ছোট থেকেই শহুরে জীবনে থাকার কারণে অনেকেই হয়তো মাটির কাছাকাছি যেতে পারেন নাই। 


কিন্তু আমি শহুরে হওয়া সত্ত্বেও মাটির সাথে, ক্ষেতের সাথে মিশতে পেরেছি। কারণ বছরে যে ৩-৪ দিনের জন্য গ্রামে যেতাম, তখন বাঁধনছাড়া করে দেওয়া হতো আমাকে। নো রুলস। আমি সারা গায়ে ধূলো মেখে খেলতাম, ক্ষেত-ক্ষামার, জঞ্জল-ডোবা-পুকুর, গাছের মগডাল সর্বত্রই যেতাম আমি। হাতে-পায়ে-গায়ে কাঁদা মেখে যখন আমি বাড়ি ফিরতাম তখন সবাই বলতো, তন্ময় মাটির ছেলে। কেউ কখনো বকুনি দিতো না আমাকে এই কারণগুলোতে। কথাটা এজন্য বললাম যে এখন অনেককেই দেখি গ্রামে গিয়ে সন্তানদেরকে মাটির সাথে মিশতে দেয় না, সন্তান যদি মিশেও যায় কিছুটা তাহলে পড়ে কড়া শাসনের কবলে। স্বাস্থ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় সবাই। হাসি পায় এসব দেখলে, আর করুণা হয় ছেলে-মেয়ে গুলোর জন্য।



শুকিয়ে আসা ডোবার কাঁদার মধ্যে হাঁটু পর্যন্ত দেবে গিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করা, আমার কাছে ছিলো শুধুই খেলা। সারা শরীরে কালো কাঁদা লেগে অদ্ভূত হয়ে যেতাম আমি। সমস্যা কি, এরপরই আবার বড় পুকুরে এলোপাথারি সাঁতার কাটবার চেষ্টা, ঝুপ-ঝাপ। শেষমেষ যখন বন্ধুদের সাথে পেড়ে উঠতাম না, তখন কান্না করতে করতে বাড়ি চলে আসতাম।


গরু-খাসী, এসব গৃহপালিত পশুর সাথে আমি যেনো কথা বলতে পারতাম। সত্যিই। ওরা আমার কথা যেনো বুঝতে পারতো। অনেক লম্বা সময় ওদের খাবার খাইয়ে, গায়ে-পিঠে-গলায় হাত বুলিয়ে কাটতো আমার। আমাদের পাড়াটা পুরোটাই সবাই আমাদের রক্তের আত্মীয়। এটা অবশ্য ছোটবেলায় জানতাম না। বড় হয়ে জেনেছি। একারণেই কোথাও যেতে, কোন গাছে উঠতে, কারো আখ ক্ষেত থেকে আখ তুলতে...কোন কিছুতেই কেউ কখনো বাধা দেয় নাই। পুরো পাড়াটাই যেনো আমার ছিলো। সত্যিকার অর্থেই আমারই ছিলো।

সত্যি কথা বলতে গ্রামে থাকবার কোন ইচ্ছা নেই আমার। যা বলছিলাম তা আমার ছোট্ট বেলার কথা। বড় হতে হতে দেখেছি গ্রামীণ সমাজ কতটা রূঢ়। এই রূঢ়তা শহুরে সমাজের রূঢ়তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। গ্রামীণ সমাজের রূঢ়তা পারিবারিক এমনকি ব্যক্তিজীবন পর্যন্ত বিস্তৃত। তাই বলে কেউ ভাববেন না, শহুরে জীবনকে আমি মাথায় তুলছি। আমি সেসবও জানি। কিন্তু সবদিকে থেকে চিন্তা করলে, আমার জন্য শহরই ভালো। কিন্তু কী আশ্চর্য দেখুন, মন কিন্তু পড়ে আছে সেই আমবাগানেই, যেখানে প্রশস্ত শাখা-প্রশাখায় পা ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে গল্প করতাম আমরা, গাঁজাখুরি গল্প, আমি এটা দেখেছি, আমার বাবা এটা করছে, ওটা করছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

এমন দাবদাহের দিন গুলোতে বিদ্যুত সংযোগহীন আমাদের গ্রামটাতে কেমন একটা হাহাকার পড়ে যেতো যেনো। দুপুর বেলা সব ফাঁকা ফাঁকা হয়ে যেতো। বড় বড় দুটো পাকুর গাছের নীচে বসে থাকতে দেখতাম দুই বুড়িকে। বড় দুটি পাতা দিয়ে নিজেদের বাতাস করতো, কোন কথা বলত না কেউই। চারিদিক শুনশান হয়ে থাকতো। হয়তোবা এই ভয়ানক নীরবতা তাদেরকে নিয়ে যেতো ফেলে আসা অতীতে। হাতড়ে বেড়াতো তারা স্মৃতি গুলো।

এত কিছু আমি দেখতে পারতাম, কারণ যতই বলুক যে দুপুর বেলা আত্মারা ঘুরে বেড়ায়, ছেলেধরারা আসে, জটাধারী পাগলেরা আসে, আমি কোন কথাতেই ঘরে থাকবার পাত্র ছিলাম না। ঠিকই এক ফাঁকে বের হয়ে সবকিছু দেখতে থাকতাম।

আমি দেখতাম, গরু গুলো ঠাই দাঁড়িয়ে থাকতো। ভীষণ ক্লান্ত। আম বাগানের দিকে যেতে পারতাম না, একটা অশরীরী অনুভূতি হতো। পুকুরগুলোর জল থাকতো স্পন্দনহীন। আকাশে মেঘ থাকতো না, অতিরিক্ত রোদের কারণে আকাশ দেখতাম উজ্জ্বল রূপালী রং এর। আমি ঘামতাম, আবার নিজেই একটা বড় পাতা জোগাড় করে সেটা দিয়ে নিজেকে বাতাস করতাম। একাকীত্ব ঘোচাবার জন্য কল্পনা করে নিতাম কাউকে আমার সঙ্গী হিসাবে। তার সাথে কথা বলতাম। আমার কথাও আমি বলতাম, তার উত্তরটাও আমিই বলতাম। বাঁশবাগানটাকে অবশ্য আমি সত্যিকার অর্থেই ভয় পেতাম, ভয়ানক। এবং আমি এখনও আগের মতোই ভয় পাই। 

বড় হতে হতে গ্রামে যাওয়া একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। রিসেন্টলি কয়েকবার গেলাম। একাকী সুযোগ পেয়ে হাতড়ানোর চেষ্টা করলাম আমার গ্রামবেলা। এই মেঠোপথ, বাঁশবাগান, দিগন্ত বিস্তৃত ক্ষেত, ঐ শশ্মান, ঐ পুকুর, সেই আমবাগান, দুটি পাকুর গাছ সবকিছুর সামনে গিয়েই বললাম, আমি এসেছি। ওরাও কথা বলেছে আমার সাথে। আমি সবার অলক্ষ্যে কাঁদা-মাটির গন্ধ শুঁকেছি, জংলী ফুল তুলেছি, আম গাছগুলো ছুয়ে এসেছি, দিগন্তের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে বুক ভরে শ্বাস নিয়েছি। কিছু কিছু স্থানের মানচিত্রই পরিবর্তন হয়ে গেছে, তবু যতদূর যাওয়া যায় গিয়েছি। তপ্ত মাটির ঘ্রাণ নিয়েছি। ঘাসের বিছানায় শুয়ে পড়ে মিশে যাওয়া চেষ্টা করেছি।...



আবারো যাবো, সুযোগ পেলেই যাবো। কিন্তু ছেলেবেলা ফেলে এসেছি দূরে। সুযোগের অভাবে থাকতে এসব পাগলামো করবার জন্য। কিন্তু আমার কাছে প্রকৃতি মানেই এমনটা, যা কখনো কেউ যত্ন করে তৈরী করেনি, আপনা থেকেই হয়েছে, তাই যতই আমি যাই না কোন সাজানো-গোঁছানো বাগানে, মন আমার পেতে চায় ঐ জংলী ফুলকেই। ঐ....ঐ সবকিছুকেই। 


আবারো যাবো, সুযোগ পেলেই যাবো।

Recommended Recommends

Comments

Contact Us

Loading...