যা আপনার নিয়ন্ত্রনে নেই তা নিয়ে অধিক দুশ্চিন্তা আপনার না করাই ভালো


নার্কোটিক্স এ্যানোনিমাস - এর কথা তাদেরই শোনার কথা যারা ড্রাগ এ্যাডিকশন এর এই ট্রিটমেন্টটির সাথে রিলেটেড। হতে পারে তিনি নিজেই এই ট্রিটমেন্ট নিয়েছেন অথবা দিয়েছেন, অথবা এদের কারো সাথে সম্পর্কিত। আমি নার্কোটিক্স এ্যানোনিমাস এর ব্যাপারে নয়, বরঞ্চ তাদের অনেক গুলো প্রেয়ার এর মধ্যে একটি প্রেয়ার এর দুটি লাইন নিয়ে আলোচনা করতে চাই।

যখন রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে ছিলাম তখন এটা বাংলায় বলতাম আমরা, এটা ছিলো 'ক্ষমার প্রার্থনা', যার দু'টি লাইন ছিলো নীচের মতো (হুবহু নয়, কারণ আমি খানিকটা ভুলে গিয়েছি)

'হে প্রভু, আমাকে সাহস দাও এটা মেনে নেবার যা আমি পরিবর্তন করতে পারবো না
আমাকে শক্তি দাও তা পরিবর্তন করবার যা আমি পরিবর্তন করতে পারি'


আমার লেখাটা মূলত সর্ব-সাধারণের জন্য। আমি রিসেন্টলি দু'জন মানুষের সংস্পর্শে এসেছি যারা অনেক বেশি দুশ্চিন্তা করে সেই সবকিছু নিয়ে যার সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রনে নেই। কিন্তু তারপরও তারা দিনরাত সেসব নিয়েই দুশ্চিন্তা করে মুখ গোমড়া রাখে, হতাশ হয়ে থাকে। আমি নিশ্চিতভাবেই একজন ইঞ্জিনিয়ার হয়ে এখানে ডাক্তারি চিকিতসা দিতে আসিনি। তবে এটা ঠিক যে মনের সুস্থতা অনেক শারিরীক অসুস্থতাকে নিজেই নিরাময় করতে পারে। এমনটা আমি অন্তত বিশ্বাস করি।

যদি আপনি একজন সর্বশক্তিমানে বিশ্বাস, অর্থাত যদি আস্তিক হয়ে থাকেন তবে আপনার নিয়ন্ত্রনের বাইরের বিষয়গুলো আপনি তাঁর উপর ছেড়ে দিতে পারেন। অন্তত যেহেতু এটা আপনি বিশ্বাস করেন যে "তিনি আছেন এবং তিনি সর্বশক্তিমান", সেহেতু আপনি তাঁর উপরে আপনার নিয়ন্ত্রনের বাইরে থাকা বিষয়গুলো অর্পন করে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, বা আপনার নিশ্চিন্ত থাকারই কথা কারণ তিনি সর্বশক্তিমান।

এর মানে এই নয় যে অফিসে না গিয়ে মাসের খরচের দায়িত্বটা সর্বশক্তিমানের উপর ছেড়ে দিয়ে আপনি ঘরে শুয়ে-বসে থাকবেন। এটা আপনার নিয়ন্ত্রনে আছে, আপনি আপনার অফিস মেইনটেইন অবশ্যই করতে পারেন। কিন্তু আপনি অতীতে করা কোন ভুলের জন্য মনস্তাপে কেনো পুড়বেন, আপনি না পরিবর্তন করতে পারেন না। কিন্তু আপনি চাইলে ভবিষ্যতে আর এমনটা করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারেন, চাইলেই আপনার করা ভুল থেকে যারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলো তাদের সাহায্য করতে পারেন, তাদের কাছে ক্ষমা চাইতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে এটা সম্ভব হয় না, আমরা এমন ভুলও করতে পারি যার কারণে আমাদের পক্ষে আর সেই ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের সামনে যাওয়া সম্ভব হয় না, বা সেটা করতে গেলে নিজের ক্ষতি হতে পারে, এমতবস্থায় আমরা প্রতিদিন সর্বশক্তিমানের কাছে ক্ষমা চাইতে পারি এবং তাদের মঙ্গল কামনা করতে পারি। এরচাইতে কিছু বেশি করা যেহেতু সম্ভব নয় সেহেতু বাকিটুকু সেই সর্বশক্তিমানের কাছে অর্পন করতে পারি। এর মানে এই নয় যে আপনি দায়মুক্ত হলেন, আপনার দায় আছে জন্যই প্রতিদিন পৃথিবীর সকল প্রাণীর প্রার্থনার পাশাপাশি তাদের জন্য আপনি আলাদা ভাবে প্রার্থনা করছেন এবং ক্ষমাও প্রার্থনা করছেন। কিন্তু সরাসরি সাহায্য আপনি করছেন না কারণ তাতে হীতে বিপরীত হতে পারে।

উপরের এই কথাগুলো বুঝতে সমস্যা হলে একজন এ্যাডিক্ট এর জীবন থেকে ছোট উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। একজন এ্যাডিক্ট ট্রিটমেন্ট নেয় ভালো হবার জন্য, সুস্থ হবার জন্য, একটি নতুন জীবনের জন্য। এখন এই নতুন জীবনের শুরুতেই যদি সে ঠিক করে যে সে তার করে আসা ক্ষতিগুলোর ক্ষতিপূরণ করবে তবে সেটা অবশ্যই ভালো পদক্ষেপ। কিন্তু এমনও তো হতে পারে যে সে তার কোন বন্ধুর ক্ষতি, যেমন মোবাইল সেট চুরি করেছিলো বা বন্ধুটিকে ফাঁদে ফেলে তার মোবাইল ছিনতাই করিয়েছিলো কিন্তু নিজে গায়ে দাগ লাগায় নাই এবং এই ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ করতে যাওয়া মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। এ্যাডিকশন পিরিয়ডে অনেকর সাথেই তার ভুল বোঝাবুঝি বা রীতিমত দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়ে থাকতে পারে, এদিকেও তার পা না বাড়ানই ঠিক হবে। শুধু সে এসবরে জন্য ক্ষমা চাইতে পারে এবং তাদের মঙ্গল প্রার্থনা করতে পারে সর্বশক্তিমানের কাছে, এবং এমনটা যেনো সে আর কখনো না করে সেটাই তার লক্ষ্য হওয়া উচিত।

পরিবারে নানা সমস্যার উথ্থান হয় নানা সময়ে, সব সমস্যার সমাধান আপনার হাতে নাও থাকতে পারে। যেমন বাড়িতে আপনার বড় ভাইয়ে বা কারো ভীষণ অসুখ হলো, আপনার বাবার হাতে তেমন টাকা পয়সাও নাই, তার উপর কোন উতসব বাবদ রিসেন্টলি অনেকগুলো টাকা খরচ হয়েছে। এমতবস্থায় আপনার ফাইনাল পরীক্ষাও চলছে। কিন্তু পরিবারের মানুষগুলোর এমন খারাপ দিনে আপনারও ভীষণ মন খারাপ আর তাই পড়ে পারছেন না। ভাবছেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভিন্ন দৃষ্টিতে এটা স্বাভাবিক নয়। আপনি এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করেন না, করে আপনার বাবা। আপনি এসবরে জন্য সর্বশক্তিমানের উপর ভরসা, তাঁর কাছে আপনার বাবাকে সাহায্য করবার জন্য প্রার্থনা করতে পারেন, এবং নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে সর্বশক্তিমানের সাহায্যে আপনার বাবা এহেন সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসবেন। এবং আপনি আপনার পড়াশোনা চালিয়ে যান। এই সব ঝড় কেটে গেলে যখন আপনার রেজাল্ট বেরুবে তখন এত ঝড়েরর পরেও আপনার অনাকাঙ্খিত ভালো রেজাল্ট আপনার পরিবারের সবাইকে যেমন খুশি করবে তেমনি আপনার লক্ষ্য ও পথও ঠিক থাকবে। এর মানে এটা দাঁড়ালো না যে আপনি স্বার্থপরের মতো নিজেরটা চিন্তা করলেন। আপনি তাদের জন্য যতটুকু করতে পারেন তা আপনি অবশ্যই করেছেন, আর নিজের জন্য যা করতে পারেন তাও করেছেন। শুধু মন খারাপ বসে থাকলেই স্বার্থ-উদ্ধার করা হয় না।

আমার এই সকল আলোচনার মূল উদ্দেশ্য, আপনি আপনার সাধ্যের বাইরের সমস্যাগুলো নিয়ে দুশ্চিন্তা  না করে সর্বশক্তিমানের কাছে সেসব সমাধানের জন্য প্রার্থনা করতে পারেন এবং নিজের পথে এগিয়েও যেতে পারেন। আর যদি আপনাদের মাঝে কেউ রিকভারিং এ্যাডিক্ট থেকে থাকেন, তাহলে তাকে বলবো, নতুন জীবন শুরু করা ভীষণ কষ্টের, আর এই কষ্ট মেনে নিতে না পেরেই রিকভারিংরা স্লিপ করে। আপনার এই সমস্যা কোনভাবেই একজন নন-এ্যাডিক্টের বোধগম্য হবে না। তাই অন্য রিকভারিংদের সাথে যোগাযোগ রাখুন এবং তাদের সাথেই আপনার সমস্যার কথা আলোচনা করুন। হাল্কা অনুভব করবেন। এবং সেসবকিছুই এড়িয়ে চলুন যা ঝুঁকিপূর্ণ এবং মনের মধ্যে অপরাধবোধ দানা বাঁধতে দেবেন না, এটা স্বাভাবিক একজন মানুষের জন্য যেমনই হোক না কেনো একজন রিকভারিং এর জন্য ডেনজার সিগন্যাল। অপরাধবোধ ঝেড়ে ফেলুন এবং সর্বশক্তিমানের কাছে ক্ষমা চান এবং নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করুন 'তেমনটা আর কখনো নয়, কোন মূল্যেই নয়'

সবাই ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন। 

Google Recommends Recommends

Comments

Contact Us