“ধূর ছাই” মার্কা একটি বিকাল, চড়কি ছাড়াই চক্কর খেলাম।




২৪ নভেম্বর ২০১১


দুপুর ৩ টায় আমার ট্রেনিং সেন্টারে যাওয়ার কথা। সেখানে আমি ওয়েব ডিজাইনিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট প্র্যাকটিস করি। “ডিজিটেক ভ্যালী”, অলকার মোড়ে। বাড়ি থেকে বের হলাম, পকেটে মোট ২৩০ টাকা আছে। বাসা থেকে বের হয়ে মিছিল ঠেলে মিউজিয়াম মোড়ে পৌঁছালাম। সেখান থেকে ৪ টাকার সিগারেট ধরিয়ে ১০ টাকায় ভাড়া করলাম একটা রিকশা। অলকার মোড়ে পৌঁছে ভাড়া মিটিয়ে ট্রেনিং সেন্টারে ঢুকে দেখি ইন্সট্রাক্টর তখনো আসেননি। আমার সহপাঠীরাও নেই। ওয়েট করছি, পেপার পড়ছি, নেট ব্রাউজ করছি। ৪০ মিনিট পার হয়ে গেলো। বুঝলাম, ভাইয়া মিছিলে আটকা পড়ছে। কিছুক্ষণ পর আরেক ভাইয়া এসে সেটাই বললো। বের হয়ে আসলাম। পকেটে তখন ২১৬ টাকা। এর মধ্যে ২০০ টাকা দিয়ে আমার ৮ টা ব্ল্যাংক ডিভিডি কেনার কথা। বাকি ১৬ টাকার মধ্যে ১০ টাকা রিক্সা ভাড়া আর ৪ টাকার সিগারেট। ২ টাকা পকেটয় নমঃ। হঠাৎ.....



প্ল্যান চেঞ্জ। মাথায় এলো যে, নিউমার্কেটে যেই ব্ল্যাংক ডিভিডির দাম ২৫ টাকা করে হলে নিশ্চিত সাহেব বাজারে সেটা ২২-২৩ টাকা করে হবে। যদি তা নাও হয়, তাহলে বাইপাস প্ল্যাণ হচ্ছে যে জামাল সুপার মার্কেটের একটা দোকানে ডিভিডি এর বক্স, মানে, খাপ বিক্রি হয়, বড় জোড় ৭-৮ টাকা করে দাম। আর ব্ল্যাংক ডিভিডির দাম ১০ টাকা। তারমানে বড় জোড় ১৮ টাকায় ডিভিডি পেয়ে যাবো। মহা আনন্দে দ্রুত ৪ টাকা দান করলাম এক দোকানদারকে।


অতপর পকেটে ২১২ টাকা নিয়ে হাঁটা ধরলাম অলকার মোড় থেকে ভাংড়ী পট্টির দিকে গলির মধ্য দিয়ে, সেখান থেকে মিয়া পাড়া হয়ে জামাল সুপার মার্কেটে পৌঁছালাম। একেই বলে কপাল, কি সুন্দর করে দোকান গুলো এর ঝাপি ফেলা, কি সুন্দর নিরিবিলি পরিবেশ বিরাজমান জামাল সুপার মার্কেটে। কেনা হলো না ডিভিডি বক্স। ধূর ছাই...


রাস্তার উল্টো দিকে একটি সিডি-ডিভিডির দোকানে গিয়ে ব্ল্যাংক ডিভিডির দাম জিজ্ঞাসা করতেই দোকানদার বললো “বক্সের ডিভিডি ৩০ টাকা থেকে শুরু” !!! কোথায় আমি ভেবে আসলাম যে ২২-২৩ টাকা, সেই জায়গায় বলে কিনা ৩০ টাকা !!!


নেক্সট প্ল্যান, মণিচত্ত্বরে নিশ্চিত কমে পাবো। হাঁটা শুরু করলাম। এসে দেখি সোনাদিঘী মার্কেটের দোতলায় সিডি-ডিভিডির মাত্র একটা দোকান। আর এনারা যা বললো তা হলো এনাদের কাছে বক্সের ডিভিডি-ই নাই। নাহ...আর তো সহ্য হচ্ছে না। আমিও আজ ডিভিডি না কিনে ফিরছি না। কিন্তু কই যাবো !


পকেটের ১২ টাকা থেকে (২০০ টাকা ডিভিডির জন্য বরাদ্দ) ৪ টাকা আবার এক দোকানদারকে দিলাম। ভাবলাম এই বন্ধুটিকে নিয়ে হাঁটা শুরু করি। বাটার মোড়ের কাছে এসে মনে হলো যে এখান থেকে নিউমার্কেটে তো হেঁটে যেতে পারবো কিন্তু সেখান থেকে ৮ টাকায় তো কেউ বেতপট্টি আসবে না, তাইলে আমি বাড়ি আসবো কি করে.....


যাই হোক, নির্ভিক পথিকের মতো স্থির লক্ষ্যে হাঁটিয়া চলিলাম। কোন দিকে চাহিবার সময় নাই। বুকে বল লইয়া, ওহ সরি, বুকে হালকা ব্যাথা লইয়াই হাঁটিতে থাকিলাম। কিন্তু কোথা থেকে যে কতো জনমের চেনা জানা বড় আপনজন এক অটোওয়ালা আসিয়া তাহার আটো থামাইয়া কহিলো “ভাই কি নিউমার্কেটে যাবেন? ওঠেন”।
ডাকটা এমন দিলো যেনো কোলে বসাইবে নাকি মাথায় বসাইবে তাহাই তিনি স্থির করিতে পারিতেছেন না। যাই হোক, পা দু’খানা তড়িঘড়ি আগ বাড়াইয়া অটোতে উঠিল, শরীর তখন অটো উঠিয়া গেলো অটোতে।


নিউমার্কেটে পৌছানো মাত্র অটোওয়ালার হুলিয়া বদলে গেলো !! ব্যস্ততা আর তাড়া আছে এমন একটা ভাব নিয়ে তাকালো। পকেট থেকে শেষ ৮ টাকার ৫ টি টাকা দিয়ে জন্মের ঋণ শোধ করলাম যেনো। এই কাহিনীর শুরুতে ঠিক এই জায়গা থেকে পায়ে হাঁটা মাত্র ২ মিনিটের দুরত্বে আমার যাত্রা শুরু করেছিলাম, শেষমেষ এখানেই আবার ফিরলাম। সবিই নিয়তির খেলা......বোঝা বড়ো দায়।


যাই হোক ঢুকে পড়লাম। দোতলায় উঠেই একটি ছোট সিডি-ডিভিডির দোকানের পাশ দিয়ে যেতেই দাঁড়ায় পড়লাম। কত্তো নতুন নতুন সিনেমার ডিভিডি। সব ডিভিডি-ই হাই কোয়ালিটির। সাথে আরোও আছে কিছু হাই ডেফিনেশনের ডিভিডি। দাম ৮০ থেকে ২৫০ টাকা একেকটা ডিভিডি, একটা ডিভিডি একটা মুভি। ও, এটা তো বলাই হয় নাই যে আমি কেনো ব্ল্যাংক ডিভিডি কিনতে এসেছি। আমি প্রচুর মুভি ডাউনলোড করি। গত ২ মাসে মনে হয় ৮০ টার মতো নামাইছি। এই মুভি ‍গুলোই আমি ডিভিডিতে রাইট করে রাখি। এই কালেকশন করাটা আমার বিশেষ নেশা, শখ। কিন্তু এই আইন ভাঙ্গার ব্যাপারটি আমাকে তাড়া করে ফিরতো। আজ হঠাৎ সুন্দর সুন্দর ডিভিডি দেখে মনে হলো, নাহ, আর নামাবো না, এখন থেকে কিনবো। যত টাকা আমি মুভির ডাউনলোডে খরচ করি তা দিয়ে বড়জোড় মাসে ৭ টা ডিভিডি কেনা যাবে, মানে ৭ টা মুভি। কিন্তু আমি তো মাসে মোর দ্যান ৩০ টা করে নামাই। সে যাই হোক, আইন ভাঙ্গার ঝামেলাতো আর থাকছে না। কিন্তু কেনো যেনো মনে হলো এগুলোও কপি করা ডিভিডি, অরিজিনাল ডিভিডি থেকে রিপ করে রাইট করা। এই ধারণাটা ঠিক কিনা তা যাচাই করা হয় নি। কিন্তু যদি তাই হয়, তাহলে অন্য এক দুর্নীতিবাজকে বেশি টাকা দেওয়ার চাইতে কম খরচে মনে হয় নিজে দুর্নীতি করাটাই ভালো হবে। কি বলেন? মূল কথা হচ্ছে সিনেমা আমার চাই ই চাই। ভেবে রেখেছি, এই ডিভিডি গুলোর উৎপত্তির রহস্যটা সামনের দিন যেয়ে ভালো করে শুনে আসবো।


যাই হোক ফাইনালি আমি পৌছালাম আমার ২৫ টাকার ব্ল্যাংক-ডিভিডির দোকানে। 


হাসি মুখে বললাম, “ভাই ডিভিডি দেন, ডিভিডি দেন।”


মনে হচ্ছিলো যেনো তাক এ সাজানো ডিভিডি গুলা বুকে জড়ায়ে নামাই আনি। যাই হোক ওনারাও এক গাল হাসি নিয়ে বললো, “ভাই কয়টা দিবো।”


আমি বললাম, “৮ টা।” 


উনি ৮ টা দিয়ে বললো, “ভাই ২৪০ টাকা”। 


কি !?!?! ভুল শুনলাম মে বি, আবার জিজ্ঞাসা করলাম, “কয় টাকা?!”


দোকানি বললো “২৪০ টাকা। প্রতি পিস ৩০ টাকা।”


“কিন্তু গত মাসে যে ২৫ টাকা করে কিনলাম?”
“ভাই দাম বাড়ছে। আচ্ছা ঠিক আছে আপনি ২৮ টাকা করে দেন, মোট ২২৪ টাকা হয়, সেটাও থাক, আপনি ২২০ টাকা দেন। আপনি রেগুলার কাস্টমার বলে কথা...”


মনে মনে বললাম “আরে ধূর ছাই, রাখুন আপনার রেগুলার কাস্টমার। এই ২৫ টাকায় পাবো জন্য কতো চক্কর কাটলাম, আর আপনি বলেন কিনা দাম বাড়ছে। সাহেব বাজারেই কিনে নিলাম না কেন রে....”


যাই হোক ওনাকে বললাম, “দেখেনতো ২০০ টাকায় ৮ দেওয়া যায় কিনা। রেগুলার কাস্টমার বলে কথা, একটু চেস্টা করেন।”


“না ভাই হবে না, সব নতুন চালান। আপনি তাহলে ৭ টা নিয়ে যান।”


আর কিছু করার নেই। ৭ টাই কলেজ ব্যাগের ভেতরে চালান করলাম।


পকেটে ৩ টাকা। বাসায় যেতে লাগবে ১০ টাকা। কি করি? মানিব্যাগ ঘেটে ঘেটে আর ১ টি কয়েন বের হলো, সোনার মুদ্রা পেলাম যেনো। বলুন তো এখন আমি কি করলাম? ঠিক ধরছেন, এক দোকানদারকে ৪ টাকা দিয়ে দিলাম। এরপর হাঁটতে শুরু করলাম। বাসায় আসলাম....এসে এই চক্কর খাওয়ার কথা ভেবে নিজেই বেশ খানিকক্ষণ হাসলাম। এরপর ভাবলাম পোস্ট করবো...করাই হয়ে উঠে নাই, আজ করলাম।





Recommended Recommends

Comments

Contact Us

Loading...