ভালো হয়ে, ভদ্র হয়ে উপাধি পেলাম - ‌'বোকা', ক্ষেত্রবিশেষে 'বলদ'


আমি আজ যেমন, আজ থেকে বছর চারেকের একটু বেশি আগে ছিলাম ঠিক এর উল্টো। আজ যতটা ভদ্র থাকি আগে ততটাই অভদ্র ছিলাম। এককথায় খারাপ, রগচটা, বেয়াদব, বদমাইশ, বাটপার টাইপের একটা ছেলে ছিলাম। আরো কিছু বিশেষণ যোগ করা যেতে পারতো। তবে ব্লগে লিখা যাবে কিনা ভেবে লিখলাম না।

কিন্তু ২৯ অক্টোবর, ২০০৬ থেকে সেই যে সবকিছু বাদ দিলাম, আজ পর্যন্ত আর সেপথে হাঁটিনি। পুরোটাই বদলে গেছি আমি। 




চোখ-মুখ ভাঁজ করে বিরক্তিভরা মুখে আর রাগিরাগি চোখে কারো দিকে তাকাই না আমি। 
বিলীন হয়ে যাওয়া মুখের হাসিটাকে ইচ্ছে না হলেও ফুটিয়ে রাখি। 
হাঁটার সময় রাস্তাপথে সংযত থাকি। 
রিকসাওয়ালাকে 'আপনি' বলে সম্বোধন করি। 
কোন চায়ের দোকানে গেলে চেঁচামেঁচি করে চা দিতে বলি না। 
শুকিয়ে যাওয়া শরীরটাকে ফুটিয়ে তুলেছি। 
ঝলসে যাওয়া চামরাটাকে মসৃণ করেছি। 
বয়স্ক মানুষের সামনে পড়লে 'আদাব' বলতে ভুলি না। 
কেউ খারাপ ব্যবহার করতে পারে এমনটা বুঝলে তাকে এড়িয়ে যাই সম্ভাব্য বাজে পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে। 
কেউ বাজে ব্যবহার করে ফেললে, 'সরি ভাই, সরি ভাই' বলে কেটে পড়ি। 
ব্যাংকে গেলে লাইন ধরে থাকি। 
টিকিট কাটতে গেলে ধৈর্য্যের সাথে অপেক্ষা করি সিরিয়াল আসা পর্যন্ত।

কিন্তু এত কিছুর বিনিময়ে পেলামটা কি? 

ব্যাংকে বা টিকিক কাটার ক্ষেত্রে সিরিয়াল মেইনটেইন করলে কেউ কেউ বলে বসে, "অত বোকা হলে চলা যায় নাকি"। 
কোন অফিসে গেলে বসিয়ে রাখে।
দোকানে গেলে যদি কাস্টোমারের ভীর থাকে তো চুপচাপ অপেক্ষা করি। আমার আগে যারা আছেন তাদের হয়ে গেলে তবেই আমি দোকানদারের সাথে কথা বলবো এই ভেবে। আর তারপর আমার নীরবতার সুযোগে আমার পরে আসারাও আগে চলে যায়।
রিকসাওয়ালাকে ভদ্রভাবে আপনি বলে সম্বোধন করলে ১০ টাকার ভাড়া ১৫ টাকা চায়।
ধীর-স্থির-সংযত ভাবে থাকি বলে অনেকে আমাকে তেমন একটা পাত্তা দেয় না বিভিন্ন ক্ষেত্রে এটা ভেবে যে আমি মনে হয় বেশি চালাক-চতুর না। 
রাস্তায় কারো গায়ের সাথে ধাক্কা লাগলে বিড়বিড় করে একগাদা কথা শুনিয়ে চলে যায়।
যারা আমার অতীত জানেনা তাদের মধ্যে অনেকেতো বলেই বসে, 'আসলে জীবনে তোমার এখনো অনেক দেখার বাকি। জীবনের কিভাবে চলতে হয়, তা তুমি জানো না। চালাক-চতুর হতে হবে। এত স্লো-মোশনে চললে কি হয় বোকা ছেলে?'

মাঝে মাঝে ভাবি, সেইতো বেশ ভালোই ছিলাম।

আমি জানি আমি ভালো ছিলাম না। ওভাবে থাকলে এতদিনে বোধহয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতাম। জীবনে বহু ভুল করেছি। আমি ধরেই নিয়েছি এগুলোর মাধ্যমে সেগুলোর মাশুল দিচ্ছি। জীবনে অনেকের ক্ষতিও করেছি। ধরেই নিয়েছি যে এগুলো (এই কথাগুলো অবশ্য লিখা যাবে না) সেই অপকর্মগুলোর শাস্তি। কিন্তু তারপরও, মাঝে মাঝে হতাশা গ্রাস করে ফেলে।

আমাদের ধর্মে একটি কাহিনী আছে। --- এক গ্রামে রাস্তার পাশে একটি গাছের গুড়িতে বাস করতো একটি রাগী সাপ। সাপটি রাস্তা দিয়ে কেউ গেলেই তেড়ে আসতো। মাঝে মাঝে ছোবলও মারতো। গ্রামবাসী ভয়ে সেই রাস্তাটি দিয়ে যাওয়াই বন্ধ করে দিলো। এরই মাঝে নারদমুনী আসলেন সাপটির কাছে। সাপটি নারদমুনিকে প্রণাম করলে নারদমুনি বললেন, "তুমি এভাবে নিরপরাধ মানুষগুলোকে কষ্ট দিচ্ছো কেন? তারা তো তোমার কোন ক্ষতি করেনি? তারা তাদের মতো রাস্তা দিয়ে যাবে, তুমি তোমার মতো এখানে থাকবা।" সাপটি নারদমুনিকে কথা দিলো যে সে আর কাউকে ভয় দেখাবে না, বা ছোবল দিবে না। ধীরে ধীরে রাস্তাটি দিয়ে একজন দুজন করে যেতে লাগলো এবং খেয়াল করলো যে সাপটি গুড়ির সামনে পেঁচিয়ে পরে থাকে, আর এগিয়ে আসে না, ভয় দেখায় না। ধীরে ধীরে রাস্তাটি দিয়ে আবার লোকজন চলাচল শুরু করলো। অসার হয়ে পরে থাকা সাপটিকে লক্ষ্য কের পথিকেরা ঢিল ছুড়ে মারতে লাগলো। অনেকে সুযোগ পেলে লাঠি দিয়েও দু একটি বাড়ি মেরে দিতো। এভাবে কয়েকদিনের মধ্যেই সাপটির মরা মরা অবস্থা হয়ে গেলো। হঠাৎ একদিন নারদ মুনি আসলেন এবং সাপটি কোনমতে বের হয়ে এসে তার দুঃখের কথা বললো। নারদমুনি হেসে ফেললেন এবং গঙ্গাজল দিয়ে সাপটিকে সুস্থ করে তুললেন। তারপর বললেন, "আমি তোমাকে কারো ক্ষতি করতে মানা করেছিলাম, কিন্তু ফোঁস ফোঁস করতে মানা করেছিলাম না।"

ভগবানের লীলা বোঝা যায় না। তিনি যা করেন তা মঙ্গলের জন্যই করেন, এটা আমি সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করি। হয়তোবা সেদিন সেই সাপটির পাপ-মোচন হয়েছিলো। হয়তোবা আমার আজো হয় নি............।

সেই ২৯ অক্টোবর, ২০০৬ থেকে আমি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে, ভয়ে, কষ্টে। 'এই আমি' আমি না। তার মানে এই না যে 'সেই খারাপ আমি'টিই আমি। আমিও চঞ্চল, আমিও স্বাভাবিক। কিন্তু ভয় হয়। স্বাভাবিক হতে যেয়ে আবার না পা পিছলায় যায়। আরো কয়েক বছর অপেক্ষা করবো, স্বাভাবিকতা আসলে আপনা থেকেই আসবে। না আসলে এই আমিকেই স্বাভাবিক ধরে নিবো।

আরো অনেক কথা লিখার ছিলো। কিন্তু সে ধৈর্য্য নেই। এই কথাগুলো আমি প্রতিদিন একবার করে লিখলেও এরকমই থাকবে। কিন্তু এই চার-সাড়ে চার বছরে আজ প্রথমবার আমি এসব কথা কোথাও বললাম বা লিখলাম। 

Author: Tanmay Chakrabarty

Tanmay Chakrabarty is a former CSE student, currently working as a Senior Software Engineer with 5+ years of experience in the field of Web Application development in PHP+MySQL platform with strong skills in Javascript, JQuery, JQuery UI and CSS. He tries to write notes every week but fails due to heavy loads of duty.

Recommended Recommends

Comments

Contact Us